img

আনুমানিক আট বছরের শিশু হেনা। সারাশরীরে আঘাতের চিহ্ন। দুই চোখের নিচ, পুরো মুখমণ্ডল, গলা, ঘাড়, হাত-পা সর্বত্রই নির্মমতার চিহ্ন দগদগ করছে। হাড়জিরজিরে শরীরই বলে দিচ্ছে খাবার জোটেনি কতদিন। রাজধানীর শাহজাহানপুরের ফুটপাতে পড়েছিল এ শিশুটি। স্থানীয়দের কাছে খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে গত সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে। 

বর্তমানে সে হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসাধীন। শিশুটি বলছে, সে একটি বাড়িতে কাজ করত। কাজ পারত না বলেই গৃহকর্ত্রী তার ওপর নির্যাতন চালাত। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই ওই বাড়ি থেকে পালিয়েছে সে। তবে কোথায় কাজ করত বা মালিকের নাম কোনো তথ্যই জানাতে পারেনি শিশু হেনা। তার বাবার নাম মো. সালাম। বাড়ি হবিগঞ্জ।

অভাবের তাড়নায় রাজধানীর বনশ্রীর একটি বাসায় কাজ করতে এসেছিল ১২ বছরের শিশু হাওয়া। বাবা শুনু মিয়া কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার নগরকুল গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তাকে ওই বাসায় দিয়ে যান। নিজেকে মানবাধিকার কর্মী পরিচয় দেওয়া শরীফ চৌধুরীর বাসায়ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল শিশু হাওয়া। গৃহকর্ত্রী নাইমা তার ওপর চালিয়েছিল অমানবিক নির্যাতন। শরীরে চটের বস্তা জড়িয়ে তাকে মারধর করত। অনবরত নির্যাতনে তার শরীর কঙ্কালসার হয়ে যায়। প্রতিবেশীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। গত বছরের শেষ দিকে ওই ঘটনায় গৃহকর্তা শরীফ এবং গৃহকর্ত্রী নাইমাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। 

দু'মুঠো খাবারের আশায় মা-বাবা, ভাই-বোন, নিজ পরিবার ছেড়ে গৃহকর্মী হয়ে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলোতে আসে হেনা-হাওয়ার মতো ছোট্ট অসহায় শিশুরা। কিন্তু অনেক পরিবারেই খাবারের পরিবর্তে ছোট্ট এসব শিশুকে সহ্য করতে হয় নির্মম নির্যাতন। সারাশরীরে অসংখ্য ক্ষতচিহ্নসহ তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এমন নির্মম নির্যাতনের খবর মাঝেমধ্যেই ওঠে আসে গণমাধ্যমে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, ২০১৮ সালে ২৫ গৃহকর্মী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ৫৮ জনকে। আর আত্মহত্যা করেছে চারজন। 

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক  বলেন, গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বাদীপক্ষ দুর্বল, দরিদ্র থাকে। তারা আর্থিক অনটনের কারণে মামলা চালাতে পারে না। এ সুযোগ নেয় আসামিপক্ষ। মামলাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিচার পর্যন্ত যেতে পারে না। তার আগেই দু'পক্ষ সমঝোতা করে ফেলে এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তিনি বলেন, গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন বন্ধে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ফাঁকফোকরেই যেন তারা শাস্তির আওতা থেকে বের হতে না পারে- এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট শিশু শ্রমিক ৩২ লাখ। তাদের মধ্যে চার লাখ ২০ হাজার শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত। আর গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই কন্যাশিশু। ২০১৫ সালে প্রকাশিত 'গোপন দাসত্ব :শিশু গৃহশ্রমিক' শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গৃহকর্মে নিয়োজিত ৫৪ শতাংশ শিশু নানাভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় ৫৭ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী। 

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী মনে করেন, শিশু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হলে এ ধরনের ঘটনা কমে যেত। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে আদুরি নামে এক গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তের শাস্তি হয়েছিল। বিচ্ছিন্নভাবে এমন দু-একটি ঘটনায় নির্যাতনকারী শাস্তি পেলেও অধিকাংশ ঘটনায়ই তারা পার পেয়ে যায়। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হলেও কম সময়ের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্তি পায়। আস্তে আস্তে ধামাচাপা পড়ে যায় শিশু নির্যাতনের মতো অমানবিক এসব ঘটনা। অনেকেই আবার আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে সমঝোতা করে নিজের অপরাধ খণ্ডন করে নেয়। আবার অসংখ্য শিশু রয়েছে, যাদের ওপর নির্যাতনকারীরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। এমনকি নির্যাতনে মারা গেলেও নূ্যনতম শাস্তি হয় না ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনের চলমান অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০১৫ সালে গৃহকর্মীদের জন্য 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা' অনুমোদন দেয়। গত দুই বছরেও এ নীতিমালার বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ দৃশ্যমান হয়নি। অ্যাডভোকেট সালমা আলী মনে করেন, গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা'র যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন জরুরি।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ