img

এম. সোলায়মান :

ফেব্রুয়ারি মাস হলো ভাষার মাস। বাঙালি জাতির আত্মত্যাগ, শ্রদ্ধা ও অহংকারের মাস। ১৯৫২ সালের এই মাসেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে জীবন দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেক বীর সন্তানরা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে একটি অবিস্মরণীয় ও চিরভাস্বর দিন। প্রাণের ভাষা রক্ষা করার জন্য তরুণদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ।
তাইতো গীতিকবি আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখে গেছেন- 
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে  ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।”
“ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে  ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।”

গানটি শুনলে গর্বে বুক ভরে যায়। আমাদের মাথা উঁচু করে বাচার প্রেরণা যোগায়।  একবিংশ শতাব্দীর এ যুগেও একুশ আমাদের শেখায় আত্মমর্যাদাশীলতা হতে, কারো কাছে অন্যায়ভাবে মাথানত না করতে। বায়ান্নর সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়ই বাঙালি জাতি শক্তি পায় সংকটে মাথা উঁচু করে মোকাবেলা করার। এ যুগের সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার অনুপ্রেরণা দেয় একুশ।
কিন্তু দু:খের বিষয় হচ্ছে এ ভাষার মর্যাদাকে আমরাই ক্ষুন্ন করে চলছি। ভাষা উচ্চারণ, ব্যানার-ফেস্টুন, দেয়াল লিখনসহ এমনকি বইয়ের পাতাতেও ভাষার বিকৃত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য অত্যান্ত লজ্জার ও দু:খের। যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা আজ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি, একে অপরের প্রতি আবেগ প্রকাশ করতে পারছি, নিজেদের সুখ দু:খের কথাগুলো জানান দিতে পারছি অথচ সেই ভাষাকেই আমরা দিনে দিনে অবমাননা করছি, অমর্যাদা করছি।  
ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আজগুবি শব্দের ব্যবহার করা হচ্ছে যা বাংলা ভাষার প্রতি চরম অবমাননাকর। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী এবং তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ফেসবুক আসক্তির পাশাপাশি যেন বাংলা ভাষায় নোংরা বিকৃত শব্দের প্রতি আসক্তি বেড়ে গেছে। বন্ধু-বান্ধবীদের অবজ্ঞা করে তারা নতুন নতুন যে শব্দযুগল ব্যবহার করছে তা কি বাংলা ভাষার কোথাও উল্লেখ আছে? যেমন মাঞ্জা মারা, পল্টিবাজ, হুদাই প্যাচাল, তেলবাজ, চালবাজ, তারছিড়া, কুফালাগা, গুষ্ঠি কিলাই, বেইল নাই, যাইগা বাদ দে, আরে মামু, প্যাচগি মারে, সুইসাইড খামু, ঠ্যাক দিছে আল্টামডান, কইছে তরে, কঠিন চেহারা, মাইনকাচিপা ইত্যাদি। এ সব শব্দ কী বাংলার আদি শব্দ? নাকি বাংলা ভাষার বিকৃত রূপ? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এসব শব্দের ব্যবহার ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এ শব্দগুলো শুদ্ধ বাংলা ভাষা তো নয়ই দেশের কোনো জেলার আঞ্চলিক ভাষাও নয়। শুধু অশ্লীল শব্দের ব্যবহার নয়; পাশাপাশি ভুল শব্দের ব্যবহারও বেড়ে গেছে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। যেমন ‘একটা ফাটাফাটি মুভি’ ‘সেইরাম ব্যাপুক বিনুদুন’ ‘কাইলকা পরীক্ষা, কিছুই পড়িনাইক্যা’। এগুলো কোন ভাষার প্রকাশ?
ফেসবুকে বাংলা ভাষাকে ইংরেজি শব্দে লেখার রেওয়াজ চালু হয়ে গেছে। এতে প্রকৃত শব্দের বিকৃতি ঘটছে। আবার সংক্ষিপ্ত ভাবে শব্দের ব্যবহারে বিকৃত হয়ে ‘মূল শব্দই’ হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি ফেসবুক অনুসন্ধান করে বাংলা ভাষার শব্দের ব্যবহারে দেখা গেল কোথাও শব্দকে সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে বিকৃত করা হচ্ছে। আবার শব্দ ছোট করতে গিয়ে ভুল শব্দের ব্যবহার হচ্ছে। যেমন ‘এসেছ’ শব্দকে ‘আসছ’ ‘করেছিস’ শব্দকে ‘করছিস’, ‘তাহলে’ শব্দকে ‘তাইলে’, ‘কোথায়’ শব্দকে ‘কই’, ‘ওটা’ শব্দকে ‘ওইটা’, ‘ওগুলো’ শব্দকে ‘ওইগুলা’, ‘পাঁচটা’ শব্দকে ‘পাসটা’, ‘খরচ’ শব্দকে ‘খরছ’, ‘ধরে’ শব্দকে ‘ধইরা’, ‘কেন’ শব্দকে ‘ক্যা/কিয়াল্যাই’, ‘কাকে’ শব্দকে ‘কারে’ ব্যবহার করা হচ্ছে। যারা ফেসবুকে এ সব শব্দের ব্যবহার করছেন তারা কখনো বাংলা অভিধানের প্রকৃত শব্দ দেখেন না। কারণ, তারা ফেসবুকেই একজনের বক্তব্যের জন্য নিজেরাই জুতসই শব্দের মাধ্যমে দিচ্ছেন। বাংলা ভাষার শব্দের এই বিকৃত ব্যবহার নতুন প্রজন্মকে কী বার্তা দিচ্ছে? চলতে ফিরতে রাস্তাঘাটে প্রায়ই কানে আসে ‘আর কস না মামা, এই জিএফটাকে নিয়ে ব্যাপক প্যানার মধ্যে আছি’ ‘এমতে ক্লাস’, ‘এক্সাম নিয়ে আছি দৌরের উপ্রে’, ‘মাঝে মইদ্যে মুঞ্চায় ব্রেকআপ কইরা ফালাই’ ‘আবে হালা’ ‘মামা কমনে আছো’ ইত্যাদি। দেখা যাচ্ছে কথ্য ভাষার সংক্ষিপ্তকরণ ও উচ্চারণের বিকৃতি বাংলা শব্দের অধিক ব্যবহারে ভাষার মূল শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার নামে এমন হাজার হাজার বিকৃত শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে যার বিস্তৃতি ঘটছে এক মুখ থেকে অন্য মুখে। আভিধানিকভাবে এ সব ভাষা বা শব্দ স্বীকৃত নয়। অথচ বিকৃত শব্দের ব্যবহার বাড়ছেই। আমাদের পূর্ব পুরুষরা বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছেন। বাংলা ভাষা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা। এ ভাষা আমাদের গৌরবের, অহংকারের। 
আমরা বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে ব্যবহার না করে বুঝে না বুঝে মায়ের ভাষাকে কতই না অবজ্ঞা করছি। বাংলা ভাষার শুদ্ধতা না শিখেই ইংরেজি মিলিয়ে বাংলিশ ভাষায় অভ্যস্ত হচ্ছি। এর মধ্যে কী প্রমাণ মেলে না একুশের চেতনা আমাদের মধ্যে ফিকে হয়ে যাচ্ছে?
এই ভাষাকে নিজের করে পেতে কত আন্দোলন, কত সংগ্রাম, জীবন দিয়ে আমরা এ ভাষাকে পেয়েছিলাম আপন করে। অথচ আজ এটা নিয়ে আমাদের কারো মাথা ব্যাথা নেই। ভাষাকে শ্রুতিমধুর, শুদ্ধ, পরিশীলিত করার জন্য রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রতি বছর জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ বাংলা ভাষার বিকৃতিতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। শুধু মাত্র ফেব্রুয়ারি মাস এলেই তাদের ভাষার প্রতি নজর বাড়ে। তখন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও দেখা যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বাংলা ব্যবহার না করার জন্য জরিমানা করতে। এছাড়া ভাষা নিয়ে সারা বছরে আর কোনো খোঁজ থাকে না কর্তৃপক্ষের। ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী বইমেলা করেই তাদের দায়বদ্ধতা শেষ! নাটক-সিনেমা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা শব্দের যে বিকৃতি চলছে।  বর্তমান প্রজন্ম না বুঝে না জেনে মায়ের ভাষাকে সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে ভাষার প্রতি সমাজে বিষ ছড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এগুলো ঠেকানোর দায় কার?
মনে রাখতে হবে ভাষা শুধু ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়। এটা জাতীর অমূল্য সম্পদ। ভাষাকে শুদ্ধ ভাবে পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে আরো সচেতন হতে হবে ভাষার প্রতি। মায়ের ভাষাকে সঠিক ভাবে উচ্চারণ ও ব্যবহারের দায়িত্ব এ প্রজন্মকেই নিতে হবে। আমরা আমাদের মাতৃভাষা আঁকড়ে ধরেই পৃথিবীর মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। আমরা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চাই- মাতৃভাষাই হচ্ছে আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতির ঐতিহ্য অন্বেষণ এবং বিকশিত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। 

এম. সোলায়মান: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ