img

এম. সোলায়মান :
আমার এক বিশ্বস্ত বন্ধু সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম মাছুমের একটি অনুসন্ধানী সংবাদে দেখতে পেলাম পাঁচ বছর ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গে পড়ে আছে একটি লাশ। লাশটি দাফনের ক্ষেত্রে বেঁধেছে ব্যাপক জটিলতা! যার মৃতদেহ নিয়ে এই জটিলতা বেঁধেছে তার নাম খোকন নন্দী ওরফে রাজিব চৌধুরী/খোকন চৌধুরী। নিহত খোকনের লাশের দাবি করছেন তার দুই স্ত্রী। একজন মুসলিম ধর্মাবলম্বী হাবিবা রহমান বাবলি। অন্যজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মীরা নন্দী। এই দুই মহিলাই দাবি করছেন খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী তাদের স্বামী। মুসলিম স্ত্রীর দাবি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে রাজিব চৌধুরী নাম রেখে তাকে বিয়ে করেছিলেন। অপরদিকে মীরা নন্দীর দাবি সনাতন ধর্ম বিশ্বাস থেকেই তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। এ দ্বন্দের জন্য দু’জনই আইনের কাছে আশ্রয় নেন। কিন্তু পাঁচটি বছর হয়ে গেলেও আদালত পারেননি এ বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি করতে।

পাঁচ বছর ধরে লাশটি পড়ে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। মাঝে মধ্যে দ্বিতীয় স্ত্রী হাবিবা রহমান বাবলি মর্গে এসে খোঁজ-খবর নিলেও স্বামীর মৃতদেহের প্রতি খবর নেই প্রথম স্ত্রী মীরা নন্দী ও তাদের ছেলে মেয়েদের। রিপোর্টে আরও বেড়িয়ে আসছে এই দ্বন্দের পিছনে রয়েছে রাজধানীর ফার্মগেটে শতকোটি টাকার ক্যাপিটাল সুপার মার্কেট। যার মালিক ছিলেন মৃত খোকন নন্দী ওরফে খোকন চৌধুরী। বর্তমানে মার্কেটটি ভোগ দখলে আছেন তার প্রথম স্ত্রী মীরা নন্দি ও তার ছেলে।

অত্যান্ত দু:খজনক হলেও সত্য যে, এই সম্পদের লোভের জন্যই দুই স্ত্রীর মধ্যে চলছে চুলছেড়া বিবাদ। তারা মনে করছেন লাশটি যে দাফন কিংবা দাহ করতে পারবেন তিনিই ওই সম্পত্তির মালিক হবেন। এই ভেবে কেউ কাউকে চুল পরিমান ছাড় দিচ্ছেন না, বিধায় আদালত পড়ছে বিপাকে। কোটি কোটি টাকার মালিক ছিলেন যিনি অথচ তার লাশটিই দীর্ঘ পাঁচটি বছর ধরে পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে। এই লাশটির একটিবারও খোঁজ নিতে আসার সময় হয়না কারো। একদিকে লাশ অন্যদিকে শতকোটি টাকার সম্পদ। দুই স্ত্রীর মধ্যে কে নিবে লাশ? কে নিবে সম্পদ? তবে লাশ কেহ না নিতে পারলেও স্বামীর শতকোটি টাকার সম্পদ প্রথম স্ত্রী ঠিকই দখল করে আছেন। মনে হচ্ছে আদালতও ঘাপটি মেরে বসে আছে। একটা মৃতদেহের প্রতি দিনের পর দিন অবিচার করা হচ্ছে। এটা কতটা যুক্তিযোগ্য আমার বোধগম্য নেই। 

সংবাদ সূত্র মতে আরও জানতে পারি, ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর ঢাকার সহকারী জজ আদালত (দেওয়ানি মামলা নম্বর ২৫২/১৪, ঢাকা) বারডেম জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় ও তদারকিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মরচুয়ারিতে খোকনের মরদেহটি সংরক্ষণের আদেশ দেয়। কিন্তু আজও কেন আদালত এ সমস্যাটির সুরহা করতে পারেনি? এমন প্রশ্ন সবার মনে। আদালতের উচিত বিষয়টি অতি দ্রুত সমাধান করা। 

খোকন নন্দী ওরফে রাজিব চৌধুরী বেঁচে থাকা অবস্থায় কোটি কোটি টাকার মালিক থাকলেও আজ তার লাশ বছরের পর বছর পরে আছে মর্গে! খোঁজ নেয়ারও কেহ নেই! আপনজনরা টেনশনে আছেন সম্পদের! আদালত দিতে পারছেন না সঠিক সিদ্ধান্ত! মৃতদেহ নিয়ে বিপাকে আছেন ঢামেক কর্তৃপক্ষ! এতো দেখছি মৃত্যুই যেন তার পাপ! দিনে দিনে সত্যিই আমরা অমানুষ হয়ে যাচ্ছি। সম্পদের নেশায় উন্মাদ হয়ে আপনজনদের বলি দিতেও দ্বিধাবোধ করি না! একজন মৃত ব্যক্তিকে বছরের পর বছর মর্গে রেখে তারা ব্যস্ত সময় পার করছেন সম্পদ ও ধর্মনীতির হিসাব নিয়ে। আমরা কি এখনো ধর্মনীতির কাছে আটকে আছি? নাকি আটকে আছে আমাদের মনুষ্যত্ব। আমি সত্যিই এ বিষয়টা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছি। এমন অনাকাংখিত ঘটনা আমাদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। বিষয়টির দ্রুত সুরহা দরকার। আদালত এ ব্যাপারে খুব শিগ্রই কার্যকরী ব্যবস্থা নিবেন বলে আশা রাখি। 

এম. সোলায়মান : লেখক ও সাংবাদিক।  


 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ