img

তিন বছর ধরে কারাবন্দি নিরপরাধ পাটকল শ্রমিক জাহালম অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন। সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় বন্দি ছিলেন তিনি। গতকাল রোববার রাত ১টার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুরে।

এর আগে গতকাল দুপুরে বিরল এক আদেশে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে  গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এ আদেশের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। উচ্চ আদালত দুদকের ২৬ মামলা থেকেও জাহালমকে অব্যাহতি দিয়েছেন। 

আদালত বলেন, 'কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে এক মিনিটও কারাগারে রাখার পক্ষে আমরা নই। এই ভুল তদন্তে কোনো সিন্ডিকেট জড়িত কি-না, সিন্ডিকেট থাকলে কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা চিহ্নিত করে আদালতকে জানাতে হবে। না হলে আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে।' এ সময় নিরপরাধ জাহালমের তিন বছরের কারাবাসের সমালোচনা করে হাইকোর্ট আরও বলেন, 'অপরাধী না হওয়ার পরও একজনকে কেন জেল খাটতে হলো? দুদককে স্বচ্ছ হতে হবে।'

কালিয়াকৈর প্রতিনিধি জানান, জাহালমকে মুক্তির বিষয়ে আদালতের আদেশের কপি রাত পৌনে ১টায় কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছায়। এরপর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তাকে। সন্ধ্যা থেকেই জাহালমের ভাই শাহনুর ভাইকে নেওয়ার উদ্দেশ্যে কারাগারের সামনে অপেক্ষায় ছিলেন। জাহালম কারাগার থেকে বের হয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

পরে সাংবাদিকদের জাহালাম বলেন, 'আমি কখনও চিন্তা করিনি যে এত মামলা মোকাবেলা করে জীবনে কোনোদিন মুক্তি পাব। জেলে অনেক কষ্টে দিন কেটেছে। আমি ক্ষতিপূরণ চাই।' তিনি এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুবিচার দাবি করেন। এ ঘটনায় তিনি চ্যানেল টোয়েন্টিফোরসহ সংশ্নিষ্ট গণমাধ্যম ও উচ্চ আদালতকে ধন্যবাদ জানান। 

গত ২৮ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে 'স্যার, আমি জাহালম, সালেক না' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আবু সালেকের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে জেল খাটছেন ও আদালতে হাজিরা দিয়ে চলেছেন জাহালম। ৬ ফেব্রুয়ারি জাহালমের কারাবাসের তিন বছর পূর্ণ হবে। একটি মামলায় তার জামিন হয়েছে। আরও ৩২টি মামলায় জামিন পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি। অবশ্য এরই মধ্যে কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে দুদক। 

ওই দিনই প্রতিবেদনটি হাইকোর্টের উল্লেখিত বিচারপতিদের বেঞ্চে উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত। পরে ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত (সুয়োমোটো) হয়ে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধিসহ চার কর্মকর্তাকে তলব করেন। তাদের হাইকোর্টে হাজির হয়ে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। এ ছাড়া দুদকের মামলায় গ্রেফতার জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তাও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে। 

ওই আদেশ অনুসারে গতকাল সকালে আদালতে হাজির হন দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি দুদকের মহাপরিচালক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান, মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাহিদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব সৈয়দ বেলাল হোসেন এবং আইন সচিবের প্রতিনিধি সৈয়দ মুশফিকুল ইসলাম। আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। জাহালমের পক্ষে ছিলেন অমিত দাশগুপ্ত। 

শুনানিতে খুরশীদ আলম খান বলেন, সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তথ্য পাওয়ার পর দুদক প্রকৃত অপরাধী আবু সালেকের বিরুদ্ধে মামলা করে। দুদক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল জাহিদ মামলার অনুসন্ধান করেন। তার অভিযোগপত্রে জাহালমের নাম উঠে আসে। টাঙ্গাইলের স্থানীয় চেয়ারম্যান জাহালমকে শনাক্ত করেন। এ পর্যায়ে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, 'এ মামলায় যাকে আসামি করা উচিত ছিল, তাকে বানালেন সাক্ষী। আরেকটি জজ মিয়া নাটক বানালেন নাকি?' আদালত আরও বলেন, 'বাংলাদেশের জন্য দুদকের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টিআইবি কী রিপোর্ট দিল, সেটা আমাদের উদ্বেগ না। কারণ, টিআইবিও ভুল করতে পারে। দুদক যদি যথাযথভাবে কাজ না করে, তাহলে আমাদের যে উন্নয়ন হচ্ছে, তা স্থায়ী হবে না। দেশ পাকিস্তান হতে বেশি সময় লাগবে না, আমাদের ভিক্ষা করতে হবে।'

আদালত বলেন, 'আমরা দুদকের কাজে হস্তক্ষপ করতে চাই না। দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করুক, এটা আমরাও চাই। আগেও আপনাদের (দুদক) ব্যাংকের দুর্নীতি মামলায় সাবধান করেছি। মনে রাখতে হবে, এটি একটি স্বাধীন দেশ।'

দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, 'অনেক মামলায় দেখেছি, আপনারা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামার আগেই তাকে নোটিশ দিয়ে দেন। অথচ পরে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই নেই। তাহলে কেন নোটিশ দিচ্ছেন?'

এ সময় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, 'জাহালমের বিষয়টি যখনই আমাদের নজরে এসেছে, সঙ্গে সঙ্গে তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।' বিচারক দুদকের আইনজীবীকে বলেন, 'আপনারা যখন বুঝতে পারলেন যে লোকটা নির্দোষ, তখন আপনারা কী করেছেন? একদিনের জন্যও আপনারা তাকে রাখতে পারেন না। কেন আপনারা তার মুক্তির ব্যবস্থা করলেন না?' 

জবাবে দুদকের আইনজীবী বলেন, 'অধিকতর তদন্তে জাহালমের বিষয়টি জানার পর দুদকের পিপিরা (কৌঁসুলি) তার জামিনে কোনো আপত্তি করেননি। এরই মধ্যে চারটি মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে।' এ পর্যায়ে আদালত জানতে চান, দুদকের যে তদন্ত কর্মকর্তারা জাহালমের নামে ভুল অভিযোগপত্র দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জবাবে খুরশীদ আলম বলেন, জাহালমকে সব মামলা থেকে অব্যাহতি দিলে দুদকের কোনো আপত্তি থাকবে না। 

এ পর্যায়ে হাইকোর্ট বলেন, 'এ রকম ভুলের দায় দুদক কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। জাহালমের কারাবাসের মেয়াদ একদিন বাড়বে, তো দুদকের ওপর কমপেনসেশন (ক্ষতিপূরণ) বাড়বে। এটি নির্ধারণ করতে হবে। দুদক করুক বা ব্যাংক করুক।' পরে আদালত জাহালমকে দুদকের ২৬ মামলা থেকে অব্যাহতির পাশাপাশি রোববারই তাকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন। পাশাপাশি দুদককে সতর্ক করে হাইকোর্ট বলেন, 'ভুয়া তদন্তের কোনো সুযোগ নেই। দুদককে অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে। জাহালমের কারাবাসের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, তাদের অভ্যন্তরীণভাবে চিহ্নিত করতে হবে। তাহলে আমাদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকবে না। যদি না হয়, তাহলে কিন্তু আমরা করব।' 

এ সময় এজলাসে উপস্থিত এক উপ-কারা মহাপরিদর্শককে হাইকোর্ট বলেন, 'আপনারা আজই জাহালমকে মুক্ত করে দেবেন।' পরে আগামী ৬ মার্চ পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ